বাংলাদেশে সার্ক জন্ম লাভ করেছে। সার্কের উদ্যোক্তা বাংলাদেশকে তাই হতাশ হলে চলবে না। ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্বোধনী শীর্ষ সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস জয়বর্ধনে বলেছিলেন, 'সার্ক একটি তরীর মতো। বিভিন্ন কারণে এ নৌযান ঝড়ের মধ্যে পড়ে আবর্তিত হবে। কিন্তু তরীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে'। প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সার্ককে দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের জনগণের উন্নয়নে এগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশকেই যেতে হাল ধরতে হবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৫ সালে সার্ক সম্মেলন শুরু হলেও এর বীজ বপন হয়েছিল আরও আগে। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ব্লাষ্ট ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এই আলোচনার ফলপ্রসূ হিসেবে ১৯৮০ সালে দক্ষিণ এশীয় সাতটি দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রয়োজন উল্লেখ করে একটি শীর্ষ স্মমেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব গৃহীত হয়। আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাব একটি যুক্ত ঘোষণা আকারে গৃহীত হওয়ার আগে ১৯৮১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৮৩ সালের জুলাই পর্যন্ত সাতটি দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের পাঁচটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয় কলম্বে, কাঠমান্ড, ইসলামাবাদ, ঢাকা ও দিল্লিতে। পররাষ্ট্র সচিবদের দিল্লি বৈঠকে ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব যুক্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে গৃহীত হয়। সার্কের সদর দপ্তর নির্ধারন করা হয় নেপালের কাঠমুন্ডু। এরপর বিষয়টি আসে রাজনৈতিক পর্যায়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা দিল্লি, মালে, থিম্পু এবং ঢাকায় আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকগুলোতে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্র প্রস্তুত ও চূড়ান্ত করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়ার আগেই অবশ্য সাতটি দেশ (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা দক্ষিন এশিয়ায় সহযোগিতার ১১টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছেঃ ১। টেলিযোগাযোগঃ ২। আবহাওয়া; ৩। পরিবহন; ৪। জাহাজঃ ৫। পর্যটনঃ ৬। কৃষি ও গ্রামীণখাত: ৭। যৌথ উদ্যোগঃ ৮। বাজার সম্প্রসারণঃ নির্বাচিত পথ্যসমূহঃ ৯। বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহযোগিতা; ১০। শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাঃ ১১। সংস্কৃতিক সহযোগিতা।
১৯৮৩ সালের আগস্ট মাসে নয়াদিল্লিতে প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও একটি সমন্বিত কার্যব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য ফোরাম গঠনের কার্যকারিতা সম্বন্ধে এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ একমত হন। উদ্দেশ্য ও নীতিমালাগুলো হচ্ছেঃ ১। দক্ষিণ এশীয় জনগণের কল্যাদ ও মান উন্নয়ন করা। ২। এ সকল অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করা। ৩। প্রতিটি নাগরিককে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ দেয়া ও তার সম্ভাবনাকে পূর্ণ বিকাশে সহায়তা করা। ৪। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যৌথ স্বনির্ভরতাকে উন্নত ও জোরদার করা। ৫। একে অন্যের সমস্যায় পারস্পারিক আস্থা, সমঝোতা ও সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করা। ৬। আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ও পাস্পারিক সহযোগিতায় উন্নয়ন ঘটানো। ৭। অভিন্ন স্বার্থের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা এবং অনুরূপ লক্ষ্য ও উদ্দেশোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের সঙ্গে সহযোগিতা করা। ৮। সার্বভৌম সমতা, আঞ্চলিক অখন্ডতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। ৯। এসব সহযোগিতায় দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিকল্প হবে না বরং উভয়েরই সম্পূরকরূপে গণ্য হবে, ১০। এ ধরনের সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিক ও বহুমুখী বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সঙ্গতিহীন হবে না। এই সকল উদ্দেশ্য ও নীতিমালাকে সামনে রেখে পারস্পারিক সহযোগিতা, বিশ্বাস ও সমঝোতার মনোভাব নিয়ে প্রথম সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায় ১৯৮৫ সালের ০৭ ডিসেম্বর। স্বাগতিক দেশ বাংলাদেশ সহ সার্কভুক্ত দেশগুলো হলো ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান। ঢাকায় প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠানের পর পারস্পারিক সহযোগিতার এই মনোভাব নিয়ে একের পর এক সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় সম্মেলন ভারতের ব্যাঙ্গালোরে ১৯৮৬ সালের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর। তৃতীয় সম্মেলন নেপালেরকাঠমান্ডুতে ১৯৮৭ সালের ০২ ও ০৪ নভেম্বর। চতুর্থ সম্মেলন পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ১৯৮৮ সালের ২৯-৩১ ডিসেম্বর। পঞ্চম সম্মেলন মালদ্বীপের মালেতে ১৯৯০ সালের ২১-২৩ নভেম্বর। ষষ্ঠ সম্মেলন শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ১৯৯১ সালের ২১ ডিসেম্বর। সপ্তম সম্মেলন বাংলাদেশের ঢাকায় ১৯৯৩ সালের ১০-১১ এপ্রিল। অষ্টম সম্মেলন ভারতের নয়া দিল্লিতে ১৯৯৫ সালের ০২-০৪ মে। নবম সম্মেলন মালদ্বীপের মালে ১৯৯৭ সালের ১২-১৪ মে। দশম সম্মেলন শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ১৯৯৮ সালের ২৯-৩১ জুলাই। একাদশ সম্মেলন নেপালের কাঠমুন্ডুতে ২০০২ সালের ০৪-সে৬ জানুয়ারি। দ্বাদশ সম্মেলন পাকিজনের ইসলামাবাদে ২০০৪ সালের ০২-০৬ জানুয়ারি। এয়োদশ সম্মেলন বাংলাদেশের ঢাকাতে ২০০৫ সালের ১২-১৩ নভেম্বর চতুর্দশ সম্মেলন ভারতের নয়াদিল্লিতে ২০০৭সালের ০৩-০৪ এপ্রিল। পঞ্চদশ সম্মেলন শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ২০০৮ সালের ০১-০৩ আগস্ট। ষোড়শ সম্মেলন ভুটানের থিম্পুতে ২০১০ সালের ২৮-২৯ এপ্রিল। সপ্তদশ সম্মেলন মালদ্বীপের আন্দু সিটিতে ২০১১ সালের ১০-১১ নভেম্বর। অষ্টাদশ সম্মেলন নেপালের কাঠমুন্ডুতে ২০১৪ সালের ২৬-২৭ নভেম্বর দেখতে-দেখতে সার্কের বয়স ৩৬ বছর পার হয়ে গেল। এই ৩৬ বছরে ১৮ টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার্টার অনুযায়ি প্রতিবছর একবার 'সামিট' হওয়ার কথা থাকলেও সেটা হয়ে উঠেনি। প্রায় সময়ই দেখা গেছে আয়োজনের শেষ পর্যায়ে এসে সম্মেলন স্থগিত হয়ে গেছে। সার্কের চার্টার বা সনদ অনুযায়ি সার্কের কর্মসূচি গৃহীত হয়ে থাকে ঐক্যমতের ভিত্তিতে। ১৯তম সম্মেলন ৯ ও ১০ নভেম্বর ২০১৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত হয়ে গেছে। প্রথমে ভারত ও পরে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান না করার কথা জানিয়ে দিয়েছে। সার্কের সর্বশেষ সদস্য রাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ভুটানও অসম্মতি প্রকাশ করেছে। সার্ক সনদ অনুযায়ী সদস্য যে কোনো একটি দেশ যোগদানে অসম্মত হলেই আপনা আপনি সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়।
সার্ক জোটের ভাবনা নিয়ে এখন যে আদৌ এগোনো সম্ভব নয়, ভারত সফররত নেপালের তৎকালীন প্রধান্মন্ত্রীকে দিল্লি তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ২০১৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে হওয়ার কথা থাকলেও মুলত ভারত পাকিস্তানের সংঘাতের জেরেই তা হতে পারেনি এবং অদূর ভবিষ্যতে যে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই সেটাও ভারতের এই অবস্থান থেকে পরিস্কার। সার্কের পরিবর্তে ভারত এখন 'বিমস্টেক' বা 'বিবিআইএন' এর মতো বিকল্প জোটগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করলেও পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, সার্কের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দেওয়ার সময় আসেনি- আর সেটা উচিতও হবে না। প্রায় আট বছর আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে সার্কের শেষ শীর্ষ সম্মেলন হয়েছিল নেপালের কাঠমুন্ডুতে। নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি ওলি যখন দিল্লিতে এসে সার্কের প্রসঙ্গ তোলেন, ভারত কিন্তু তাকে জানিয়ে দেয় পাকিস্তান যেভাবে সীমান্ত পাড়ের সন্ত্রাসবাদ মদদ দিয়ে চলেছে তাতে তারা একেবারেই নিরুপায়।
সার্কের দরজা আপাতত বন্ধ করে দিয়ে ভারত যে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বিমস্টেক জোট কিংবা বাংলাদেশ-ভুটান- নেপালকে নিয়ে বিবিআইএন- এই বেশি সম্ভবনা দেখছে, সেটাও কোনো গোপন কথা নয়। তবে দিল্লীর থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিচার্স ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা অট্টাচার্য মনে করেন, এগুলো ঠিক সার্কের বিকল্প নয়- বরং পরিপুরক। পাকিস্তানে সার্ক সামিট বয়কটের প্রশ্নে যেভাবে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা ও ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল জোটের সদস্য দেশগুলোর সেই অবস্থান কি এখনও অক্ষুন্ন থাকবে জয়িতা অট্টাচার্য বলেছেন, দেখুন সন্ত্রাসবাদের ভুক্তভোগী- এই দেশগুলো সবাই। কাজেই প্রশ্নটা যেখানে সন্ত্রাসবাদের আমার ধারনা ভারতের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে- কারণ এটা এমন একটা ইস্যু: যা থেকে তাদের সরে আসার কোনো কারন নেই। তবে সার্ক এখন হচ্ছে না মানে আর কোনো দিনই হবে না এমনটা কিন্তু বলা যায় না। বড়জোড় বলা যায় সার্ক সাসপেনশনে আছে- কারণ জিও পলিটিক্স নিয়ত বদলাতে থাকে, একটা সহযোগিতা জোট চিরতরে পরিত্যাক্ত বলাটা ঠিক নয়। কিন্তু বিমসটেক কিছুটা সফল হলেও তাতে সার্ক চিরতরে মুছে যাবে এমনটা মনে করেন না রাষ্ট্রবিজ্ঞানি ও অধ্যাপক ইমন কল্যাণ লাহিড়ি। আমরা বলি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও ফুলস্টপ হয় না। হয় শুধু কমা। সুতরাং সার্কের ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি। পাকিস্তান দেশটা আমাদের পশ্চিম সিমান্তে থাকবেই, আর তাদের সঙ্গে আজ না হয় কাল আলোচনাও চালাতে হবে। এই দুটো দেশের বিদেশনীতি ও একে অন্যকে ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। আর তা ছাড়া বিবিআইএন দেখুন, সেখানে ভুটান আপত্তি জানিয়েছে মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্টে, তাই সেটা কার্যত বিআইএন হয়ে দাড়িয়েছে বিমসটেকও মোরেহ- তামু কিংবা অন্যান্য সীমান্ত চৌকিতে যে বানিজ্য হচ্ছে তা একেবারে নগন্য।
সোজা কথায়, সার্ক নিয়ে ভারত নিরুখ-সাহী হয়ে পড়লেও তার অন্য বিকল্পগুলোও যে দারুন সাড়া ফেলতে পারছে তা মোটেও নয়। আর ঠিক এ কারণেই ভারতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সার্ক এখনও মারা যায় নি- কিন্তু কোমায় আছে। সার্কের ১৪তম বর্তমান মহাসচিব শ্রীলঙ্কার নাগরিক এসালা রোয়ান ওয়েরাকুন সার্কের অগ্রগতির বিষয়ে কোনো উদ্দ্যোগ নেন নি বললেই চলে। সার্কের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রধানত ভারতের মনোভাবের জন্যই সার্ক গতিশীল হতে পারছে না। ভারতের কারণে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বারবার স্থগিত হচ্ছে। সার্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ হচ্ছে সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা। বংলাদেশে সার্ক জন্মলাভ করেছে। সার্কের উদ্যোক্তা বাংলাদেশকে তাই হতাশ হলে চলবে না। ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্বোধনী শীর্ষ সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস জয়বর্ধনে বলেছিলেন, 'সার্ক একটি তরীর মতো। বিভিন্ন কারণে এ নৌযান ঝড়ের মধ্যে পড়ে আবর্তিত হবে। কিন্তু তরীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে'। প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সার্ককে দক্ষিন এশিয়ার আট দেশের জনগণের উন্নয়নে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকেই হাল ধরতে হবে।