ডিম-মাংস খায় না দেশের ৩৮% শিশু: ইউনিসেফ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
সংগৃহীত ছবি: ফেসবুক
সংগৃহীত ছবি: ফেসবুক

বাংলাদেশের ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুদের খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর খাবারের অপ্রতুলতা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। ইউনিসেফের ‘শিশু পুষ্টি প্রতিবেদন ২০২৫’-এ শিশুদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এই  চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৩৮ শতাংশ শিশু ডিম ও মাংস খায় না, ৪৬ শতাংশ শিশু খায় না শাকসবজি ও ফলমূল। অথচ ৫৯ শতাংশ শিশু নিয়মিত মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পানীয় গ্রহণ করে এবং ২০ শতাংশ শিশু খায় লবণাক্ত ও ভাজা খাবার।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের মধ্যে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থূলতা। বিশেষত শিশুদের ওজন বাড়লেও পুষ্টিহীনতা থেকে যাওয়ায় এটি দ্বিগুণ বোঝা হয়ে উঠেছে। এ ধরনের স্থূলতার হার সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়। এসব দেশে পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য স্বল্পমূল্যের ও সহজলভ্য হওয়ায় এবং ডিম-মাংস-সবজি-ফলের মতো খাদ্য তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় শিশু-কিশোররা এ ধরনের খাদ্য অধিক গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনে মূলত তিনটি বিষয় উঠে এসেছে—ছোট শিশুদের (৬ থেকে ২৩ মাস) মধ্যে অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রবণতা, স্কুল পরিবেশে ফাস্ট ফুড ও চিনিযুক্ত পানীয়ের আধিক্য এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত ওজনের হার, যদিও বর্তমানে তা তুলনামূলকভাবে কম।

একজন প্রাপ্তবয়স্কের যে ধরনের খাবার প্রয়োজন, শিশুরও সে খাবার দরকার হয়। যেমন শাকসবজি, মাছ, মাংস, ভাত, ডিম, ফল— এগুলো তারও প্রয়োজন। কিন্তু আমরা তাকে সেটা দিতে অভ্যস্ত নই। আমাদের শিশুরা ‘অভ্যাসব্যাধি’তে আক্রান্ত। শিশুরা তার প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেতে চায় না।

এর অন্যতম কারণ আশপাশের জাংকফুড, মিষ্টিজাতীয় খাবার। শিশুদের মধ্যে খাবারের অভ্যস্ততা, স্ক্রিন আসক্তি বেড়েছে। যা তার শরীরে ভিটামিনের অভাব তৈরি করে। এখন ফাস্ট ফুডের দোকানগুলো কার্বনমিশ্রিত যে খাবার বিক্রি করছে, সেটা ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রচণ্ড ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে এসব ঝুঁকি। মূল কথা হচ্ছে, এখান থেকে পরিত্রাণের জন্য আর্থিক সংকটের দোহাই না দিয়ে প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা।’

দক্ষিণ এশিয়ার স্কুল এলাকার খাদ্যের পরিবেশ, পরিবেশন ও গ্রহণ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে ইউনিসেফ। সেখানে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় স্কুলে যাওয়া শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতা কম হলেও তা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর অপুষ্টি ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এখনো উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের সংস্থাটি ২০২৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্কুলের খাদ্য পরিবেশন ও বিপণন নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। 

এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের অনেক স্কুলে প্যাকেটজাত খাবার ও ফাস্ট ফুড তাজা ফলমূল বা সবজির তুলনায় বেশি সহজলভ্য। এসব দেশে কিশোর-কিশোরীদের ৪৮ শতাংশের স্কুলে ক্যান্টিন বা শপ আছে। ৪৯ শতাংশের কম শিক্ষার্থী তাজা শাকসবজি বা ফল খেতে পায়। বিপরীতে এসব দেশে প্যাকেটজাত খাবার ৬১ শতাংশ, ফাস্ট ফুড ৫৫ শতাংশ, চিনি-মিষ্টিযুক্ত পানীয় ৫৫ শতাংশ শিশু খেয়ে থাকে। 

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় তাজা শাকসবজি বা ফলের তুলনায় অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রাপ্যতা বেশি। ভুটানে তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার পাওয়া যায়। বাংলাদেশে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে প্রভাবিত করে খাবারের চটকদার বিজ্ঞাপন। ৫৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বিজ্ঞাপন দেখে খাবার পছন্দ করে। ৬৪ শতাংশ স্কুল প্রাঙ্গণে খাবারের বিজ্ঞাপন দেখে অস্বাস্থ্যকর খাবার কেনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের হার প্রায় ৮ শতাংশ, যেখানে মালদ্বীপে এ হার ৩২ শতাংশ। পুষ্টির অভাব ও লবণাক্ত, ভাজা ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের আসক্তির ফলে মানুষের মধ্যে বাড়ছে ওজন বৃদ্ধি, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি। বৈশ্বিকভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৫ শতাংশ অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছে। এ ছাড়া ২০ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর ওজন বেশি। লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায় অতিরিক্ত ওজনের হার বেশি। 

পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ১০-১৯ বছর বয়সীদের অর্ধেকেরও বেশি অতিরিক্ত ওজন নিয়ে বাস করছে। সাধারণভাবে ছেলেদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের হার মেয়েদের তুলনায় বেশি। ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুর খাবারের তালিকায় স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ কম। ৩৮ শতাংশ শিশু ডিম-মাংস খায় না। ৪৬ শতাংশ শিশু শাকসবজি ও ফল খায় না। ফিলিপাইনে এ হার যথাক্রমে ৩৭ ও ২৭ শতাংশ। থাইল্যান্ডে ১২ শতাংশ শিশু ডিম, মাংস এবং ১৬ শতাংশ শিশু শাকসবজি ও ফল খায় না।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত