কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা এক কিশোরীর নিথর দেহ—এই দৃশ্য দেশের সীমান্ত সুরক্ষার ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল। সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোরী ফেলানীর ভাই আরফান হোসেন, যিনি এতদিন ধরে বহন করে চলেছেন এক পরিবারের গভীর বেদনা, তিনি এবার সেই কাঁটাতারেই দাঁড়িয়ে দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চলেছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর স্বপ্নের পথে হেঁটে আরফান সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) যোগ দিয়েছেন, যা তার পরিবারের জন্য এক নতুন প্রাপ্তি ও গর্বের মুহূর্ত।
বেদনাময় অতীত থেকে আলোর পথে
আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে, ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি, ভারত থেকে বাড়ি ফেরার পথে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন কিশোরী ফেলানী। তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার সেই ছবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই থেকে ন্যায়বিচারের দাবিতে লড়াই করে চলেছে তার পরিবার।
পরিবারের সেই লড়াইয়ের মাঝেও বাবা-মায়ের একটি স্বপ্ন ছিল—দেশের জন্য কাজ করা। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয় নিয়েই আরফান নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি সম্প্রতি বিজিবি নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
স্বপ্নপূরণের দিন
আজ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে আরফানের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম। এই নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে আরফান বলেন, "ফেলানীর মৃত্যুর পর সারা দেশের মানুষ যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তখন থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল বিজিবিতে যোগ দেওয়ার। আজ আমার সেই স্বপ্ন পূর্ণ হলো। আমি দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।"
ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, "আমার মেয়ের সেই করুণ দৃশ্য আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দেশের মানুষ আর বিজিবি সব সময় আমাদের পাশে থেকেছে। আজ আমার ছেলে তার মেধা দিয়ে বিজিবিতে সুযোগ পেয়েছে। এটি আমার জীবনের এক বড় অর্জন।"
বিজিবির প্রত্যয়: সীমান্তে ন্যায় ও নিরাপত্তা
লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, "বিজিবি সবসময় ফেলানীর পরিবারের পাশে ছিল। আমরা আশা করি, প্রশিক্ষণ শেষে আরফান একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল বিজিবি সদস্য হিসেবে দেশের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।" তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে ফেলানীর মতো এমন কোনো ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে বিজিবি সর্বদা সতর্ক থাকবে।
আগামীকাল শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আরফান তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগ দেবেন। এক বেদনাবিধুর অতীতকে পেছনে ফেলে আরফান হোসেনের এই নতুন পথচলা, দেশের প্রতি তার ভালোবাসা আর দৃঢ় সংকল্পের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।