জিল হোসেন—এই নামটি একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং করুণ আইনি লড়াইয়ের সমার্থক। জীবনের প্রায় ৪৭ বছর তিনি কাটিয়েছেন বিচার ও ন্যায্যতার সন্ধানে। ১৯৭১-৭২ সালে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (কৃষি) এর ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ফলাফলে তাকে অকৃতকার্য ঘোষণা করা হয়। এখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়, যা ছিল শুধুই আইনি লড়াইয়ের।
শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা, এরপর সনদ পাওয়ার পর ক্ষতিপূরণের জন্য নতুন যুদ্ধ—এভাবেই কেটেছে তাঁর জীবনের ৪৭টি বছর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হয়েও সেই জয়ের ফল দেখে যেতে পারেননি। ২০২২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, জীবনের ৭২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া এই অসমাপ্ত লড়াইয়ের ভার এখন বহন করছেন তাঁর স্ত্রী ও আট সন্তান।
যেখান থেকে শুরু হলো এই অসম লড়াই
১৯৭৩ সালের পরীক্ষায় জিল হোসেনকে অকৃতকার্য ঘোষণা করার পর তিনি বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফলাফল পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। এরপর ১৯৭৫ সালে তিনি আবার পরীক্ষায় বসতে গেলে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ১৯৭৫ সালের ২২ এপ্রিল তিনি ময়মনসিংহের আদালতে প্রথম মামলাটি করেন। তাঁর দাবি ছিল, পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে ভগ্নাংশ যোগ না করেই তাকে অকৃতকার্য করা হয়েছে, যা ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি।
নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছে জিল হোসেনকে। আদালতের রায়ে বারবার তার পক্ষে রায় এলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বারবার আপিল করেছে। এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি জিতেছেন, আবার বিশ্ববিদ্যালয় আপিল করেছে। অবশেষে আদালত ১৯৮৩ সালে চূড়ান্তভাবে জিল হোসেনের পক্ষে রায় দেন।
সনদ পেতে লেগেছিল ২৪ বছর, ক্ষতিপূরণের মামলা আরও দীর্ঘ
১৯৮৬ সালে হাইকোর্টের রায়ের প্রায় তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জিল হোসেনের আবেদন গ্রহণ করে। এরপর ১৯৯৭ সালের ২২ অক্টোবর তাকে পরীক্ষার নম্বরপত্রের সনদ দেওয়া হয়। তখন জিল হোসেনের বয়স ৪৭ বছর, সরকারি চাকরির বয়সসীমা ততদিনে পার হয়ে গেছে।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে অপেক্ষা করার পর সনদ হাতে পেলেও জিল হোসেনের স্বপ্ন তখন ভেঙে চুরমার। জীবনের সেরা সময়টা তিনি নষ্ট করেছেন আইনি লড়াইয়ে। তাই তিনি ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের মামলা করেন।
২০০৮ সালে নিম্ন আদালত জিল হোসেনের পক্ষে রায় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে ৩০ দিনের মধ্যে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আপিলের কারণে সেই রায়ও আবার আটকে যায়।
বাবার স্বপ্ন পূরণের ভার এখন সন্তানের কাঁধে
জিল হোসেনের ছোট ছেলে নূর হোসেনের কথায় এই পরিবারের দুর্দশা ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, 'বাবা উচ্চ আদালতের রায় দেখে যেতে পারেননি। বুকে চাপা কষ্ট হয়। বাবার কাছে শুনেছি, মামলা চালাতে গিয়ে জমিসহ অনেক কিছুই হারাতে হয়েছে।'
নূর হোসেনের মা ও ভাইবোনেরা এখন এই মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাদের দুশ্চিন্তা হচ্ছে, এত বছর ধরে চলতে থাকা এই লড়াই আদৌ শেষ হবে কিনা। তাদের আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস জানান, হাইকোর্টের রায়েও ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ বহাল রাখা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিভ টু আপিল করে চলেছে।
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি আইনি লড়াই নয়, এটি জীবনের একটি করুণ গল্প। একজন মানুষ, যিনি শুধু মাত্র তার ন্যায্য অধিকার চেয়েছিলেন, তাকে তার জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় ধরে এর জন্য লড়াই করতে হয়েছে। তার মৃত্যুর পরও তার পরিবারকে একই কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। জিল হোসেনের এই গল্প প্রশ্ন তোলে আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং একটি পরিবারের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে।